: জনাব, আর কিছু করতে হবে?

: না, আর কী করবে! যাও এখন।

: অন্য কিছু করার থাকলে বলুন, করে দিচ্ছি।

: চা বানাতে পারো?

: জি না। কীভাবে বানায়?

: দুধ-চিনি মিশিয়ে।

: না, আমি জানি না। আমাকে শিখিয়ে দিন।

: থাক বাদ দাও, আমি শুয়ে পড়ব।

দৈত্য মাথা নাড়তে নাড়তে বলল, আপনার মতো অদ্ভুত মানুষ জনাব আমি এর আগে দেখি নি।

: কেন?

: আলাউদ্দিনের চেরাগ হাতে পেলে সবার মাথা খারাপের মতো হয়ে যায়। কী চাইবে, কী না চাইবে, বুঝে উঠতে পারে না, আর আপনি কিনা…

নিশানাথ বাবু বিছানায় শুয়ে পড়লেন। দৈত্য বলল, আমি কি আপনার মাথায় হাত বুলিয়ে দেব? তাতে ঘুমুতে আরাম হবে।

: আচ্ছা দাও।

দৈত্য মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। নিশানাথ বাবু ঘুমিয়ে পড়লেন। ঘুম ভাঙলে মনে হলো, আগের রাতে যা দেখেছেন সবই স্বপ্ন। আলাউদ্দিনের চেরাগ হচ্ছে রূপকথার গল্প। বাস্তবে কি তা হয়? হওয়া সম্ভব না।

দুঃখে-কষ্টে নিশানাথ বাবুর দিন কাটতে লাগল। শীতের শেষে তার কষ্ট চরমে উঠল। বিছানা ছেড়ে উঠতে পারেন না এমন অবস্থা। হোটেলের একটা ছেলে দুবেলা খাবার নিয়ে আসে। সেই খাবারও মুখে দিতে পারেন না। স্কুলের পুরান স্যাররা মাঝে মাঝে তাকে দেখতে এসে দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলেন। নিজেদের মধ্যে বলাবলি করেন–এ যাত্রা আর টিকবে না। বেচারা বড় কষ্ট করল। তাঁরা নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তিনশ টাকা নিশানাথ বাবুকে দিয়ে এলেন। তিনি বড় লজ্জায় পড়লেন। কারো কাছ থেকে টাকা নিতে তার বড় লজ্জা লাগে।

এক রাতে তাঁর জ্বর খুব বাড়ল। সেই সঙ্গে পানির পিপাসায় ছটফট করতে লাগলেন। বাতের ব্যথায় এমন হয়েছে যে, বিছানা ছেড়ে নামতে পারছেন না। তিনি করুণ গলায় একটু পরপর বলতে লাগলেন–পানি। পানি। গম্ভীর গলায় কে একজন বলল, নিন জনাব পানি।

: তুমি কে?

: আমি আলাউদ্দিনের চেরাগের দৈত্য।

: ও আচ্ছা, তুমি।

: নিন, আপনি খান। আমি আপনাতেই চলে এলাম। যা অবস্থা দেখছি, না এসে পারলাম না।

: শরীরটা বড়ই খারাপ করেছে রে বাবা।

: আপনি ডাক্তারের কাছে যাবেন না, টাকা-পয়সা নেবেন না, আমি কী করব, বলুন?

: তা তো ঠিকই, তুমি আর কী করবে!

: আপনার অবস্থা দেখে মনটাই খারাপ হয়েছে। নিজ থেকেই আমি আপনার জন্যে একটা জিনিস এনেছি। এটা আপনাকে নিতে হবে। না নিলে খুব রাগ করব।

: কী জিনিস?

: একটা পরশপাথর নিয়ে এসেছি।

: সে কি! পরশপাথর কি সত্যি সত্যি আছে নাকি?

: থাকবে না কেন? এই তো, দেখুন। হাতে নিয়ে দেখুন।

নিশানাথ বাবু পাথরটা হাতে নিলেন। পায়রার ডিমের মতো ছোট। কুচকুচে কালো একটা পাথর। অসম্ভব মসৃণ।

: এইটাই বুঝি পরশপাথর?

: জি। এই পাথর ধাতুর তৈরি যে কোনো জিনিসের গায়ে লাগালে সেই জিনিস সোনা হয়ে যাবে। দাঁড়ান, আপনাকে দেখাচ্ছি।

দৈত্য খুঁজে খুঁজে বিশাল এক বালতি নিয়ে এলো। পরশপাথর সেই বালতির গায়ে লাগাতেই কাফেরঙের আভায় বালতি ঝকমক করতে লাগল।

: দেখলেন?

: হ্যাঁ দেখলাম। সত্যি সত্যি সোনা হয়েছে?

: হ্যাঁ, সত্যি সেনা।

: এখন এই বালতি দিয়ে আমি কী করব?

: আপনি অদ্ভুত লোক, এই বালতির কত দাম এখন জানেন? এর মধ্যে আছে কুড়ি সের সোনা। ইচ্ছা করলেই পরশপাথর ছুঁইয়ে আপনি লক্ষ লক্ষ টন সোনা বানাতে পারেন।

নিশানাথ বাবু কিছু বললেন না, চুপ করে রইলেন। দৈত্য বলল, আলাউদ্দিনের চেরাগ যেই হাতে পায় সেই বলে পরশপাথর এনে দেবার জন্যে। কাউকে দেই না।

: দাও না কেন?

: লোভী মানুষদের হাতে এসব দিতে নেই। এসব দিতে হয় নির্লোভ মানুষকে। নিন, পরশপাথরটা যত্ন করে রেখে দিন।

: আমার লাগবে না। যখন লাগবে তোমার কাছে চাইব।

নিশানাথ বাবু পাশ ফিরে শুলেন।

পরদিন জ্বরে তিনি প্রায় অচৈতন্য হয়ে গেলেন। স্কুলের স্যাররা তাঁকে ময়মনসিংহ হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে দিলেন। ডাক্তাররা মাথা নেড়ে বললেন-

: অবস্থা খুব খারাপ। রাতটা কাটে কি-না সন্দেহ।

নিশানাথ বাবু মারা গেলেন পরদিন ভোর ছটায়। মৃত্যুর আগে নান্দিনা হাইস্কুলের হেডমাস্টার সাহেবকে কানে কানে বললেন–আমার ঘরে একটা বড় বালতি আছে। ঐটা আমি স্কুলকে দিলাম। আপনি মনে করে বালতিটা নেবেন।

: নিশ্চয়ই নেব।

: খুব দামি বালতি…

: আপনি কথা বলবেন না। কথা বলতে আপনার খুব কষ্ট হচ্ছে। চুপ করে শুয়ে থাকুন।

কথা বলতে তাঁর সত্যি সত্যি কষ্ট হচ্ছিল। নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। বালতিটা যে সোনার তৈরি এটা তিনি বলতে পারলেন না। . হেডমাস্টার সাহেব ঐ বালতি নিয়ে গেলেন। তিনি ভাবলেন–বাহ, কী সুন্দর বালতি! কী চমৎকার ঝকঝকে হলুদ! পেতলের বালতি, কিন্তু রঙটা বড় সুন্দর।

দীর্ঘদিন নারিন্দা হাইস্কুলের বারান্দায় বালতিটা পড়ে রইল। বালতি ভর্তি থাকত পানি। পানির উপর একটা মগ ভাসত। সেই মগে করে ছাত্ররা পানি খেত।

তারপর বালতিটা চুরি হয়ে যায়। কে জানে এখন সেই বালতি কোথায় আছে!