"মঙ্গলবারে তালনবমী, না মা?”
“তা হয়তো হবে। কি জানি বাপ! নিজের হাঁড়িতে চাল জোটে না, তালনবমীর খোঁজে কি দরকার আমার?"
সারাদিন কেটে গেল। নেপাল বিকেলের দিকে জিগ্যেস করলে, “জটি পিসীমার বাড়ীতে তাল দিইছিলি আজ সকালে ? কোথায় পেলি তুই? আমি তাল দিতে গেলে পিসী বললেন, ‘তাল, গোপাল তাল দিয়ে গেছে, পয়সা নেয় নি।'—কেন দিতে গেলি তুই ? একটা পয়সা হ'লে দুজনে মুড়ি কিনে খেতাম!"
"ওরা নেমতন্ন করবে, দেখিস দাদা, কাল তো তালনবমী!”
"সে এমনিই নেমন্তন্ন করবে, পয়সা নিলেও করবে। এই একটা বোকা!"
“আচ্ছা দাদা, কাল তো মঙ্গলবার না?"
“হুঁ”।
রাত্রে উত্তেজনায় গোপালের ঘুম হয় না। বাড়ীর পাশের বড় বকুল গাছটায় জোনাকির ঝাঁক জ্বলচে ; জানালা দিয়ে সেদিকে চেয়ে চেয়ে সে ভাবে—কাল সকালটা হ'লে হয়। কতক্ষণে যে রাত পোহাবে!..
জটি পিসীমা আদর করে ওকে বললেন খাওয়ানোর সময়, “খোকা, কাঁকুড়ের ডালনা আর নিবি? মুগের ডাল বেশি করে মেখে নে।" জটি পিসীমার বড় মেয়ে লাবণ্য-দি একখানা থালায় গরম-গরম তিল-পিটুলি ভাজা এনে ওর সামনে ধরে হেসে বললে, “খোকা, ক'খানা নিবি তিল-পিটুলি ?" বলেই লাবণ্য-দি থালাখানা উপুড় করে তার পাতে ঢেলে দিলে। তার পর জটি পিসীমা আনলেন পায়েস আর তালের বড়া। হেসে বললেন, “খোকা যাই তাল কুড়িয়ে দিয়েছিল, তাই পায়েস হ'ল!....খা, খা-খুব খা -- আজ যে তালনবমী রে!"...কত কি চমৎকার ধরনের রাধা তরকারির গন্ধ বাতাসে! খেজুর গুড়ের পায়েসের সুগন্ধ-বাতাসে! গোপালের মন খুশি ও আনন্দে ভরে উঠলো। সে বসে বসে খাচ্ছে, কেবলই খাচ্ছে!......সবারই খাওয়া শেষ, ও তবুও খেয়েই যাচ্ছে..... লাবণ্য-দি হেসে হেসে বলছে, “আর নিবি তিল-পিটুলি?"
“ও গোপাল?"
হঠাৎ গোপাল চোখ মেলে চেয়ে দেখলে—জানলার পাশে বর্ষার জলে ভেজা ঝোঁপঝাড়, তাদের সেই আতা গাছটা...সে শুয়ে আছে তাদের বাড়ীতে। মার হাতের মৃদু ঠেলায় ঘুম ভেঙেচে, মা পাশে দাঁড়িয়ে বলছেন, “ওঠ, ওঠ, বেলা হয়েচে কত! মেঘ করে আছে। তাই বোঝা যাচ্ছে না।”
বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে সে মায়ের মুখের দিকে চেয়ে রইল। “আজ কি বার মা...?”
"মঙ্গলবার।”
তাও তো বটে! আজই তো তালনবমী! ঘুমের মধ্যে ওসব কি হিজিবিজি স্বপ্ন সে দেখছিল!
বেলা আরও বাড়লো, ঘন মেঘাচ্ছন্ন বর্ষার দিনে যদিও বোঝা গেল না বেলা কতটা হয়েছে। গোপাল দরজার সামনে একটা কাঠের গুড়ির ওপর ঠায় বসে রইলো। বৃষ্টি নেই একটুও, মেঘ-জমকালো আকাশ। বাদলের সজল হাওয়ায় গা সিরসির করে। গোপাল আশায় আশায় বসে রইলো বটে, কিন্তু কই, পিসীমাদের বাড়ী থেকে কেউ তো নেমন্তন করতে এলো না!
অনেক বেলায় তাদের পাড়ার জগবন্ধু চক্কোত্তি তাঁর ছেলেমেয়ে নিয়ে সামনের পথ দিয়ে কোথায় যেন চলেছেন। তাদের পেছনে রাখাল রায় ও তার ছেলে সানু ; তার পেছনে কালীবর বাঁড়ুয্যের বড় ছেলে পাঁচু, আর ও-পাড়ার হরেন ...
গোপাল ভাব্লে এরা যায় কোথায় ?
এ-দলটি চলে যাবার কিছু পরে বড়ো নবীন ভট্চাজ ও তার ছোট ভাই দীনু সঙ্গে একপাল ছেলেমেয়ে নিয়ে চলেছে।
দীনু ভটচাজের ছেলে কুড়োরাম ওকে দেখে বললে, “এখানে বসে কেন রে? যাবিনে?"
গোপাল বললে, “কোথায় যাচ্ছিস তোরা ?"
“জটি পিসীমাদের বাড়ী তালনবমীর নেমন্তন্ন খেতে। করে নি তোদের? ওরা বেছে বেছে বলেছে কি না, সবাইকে তো বলেনি......"
গোপাল হঠাৎ রাগে, অভিমানে যেন দিশাহারা হয়ে গেল। রেগে দাঁড়িয়ে উঠে বললে, “কেন করবে না আমাদের নেমন্তন্ন ? আমরা এর পরে যাবো......"
রাগ করবার মত কি কথা সে বলেচে বুঝতে না পেরে কুড়োরাম অবাক হয়ে বললে, “বারে! তা অত রাগ করিস কেন? কি হয়েছে?”
ওরা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে গোপালের চোখে জল এসে পড়লো—বোধ হয় সংসারের অবিচার দেখেই। পথ চেয়ে সে বসে আছে কদিন থেকে! কিন্তু তার কেবল পথ চাওয়াই সার হল? তার সজল ঝাপ্সা দৃষ্টির সামনে পাড়ার হার, হিতেন, দেবেন, গুট্কে তাদের বাপ-কাকাদের সঙ্গে একে একে তার বাড়ীর সামনে দিয়ে জটি পিসীমাদের বাড়ীর দিকে চলে গেল...





মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!