বদনবাবু আপিসের পর আর কার্জন পার্কে আসেন না।
আগে ছিল ভাল। সুরেন বাঁড়ুজ্যের স্ট্যাচুর পাশটায় ঘণ্টাখানেক চুপচাপ বসে বিশ্রাম করে তারপর ট্রামের ভিড়টা একটু কমলে সন্ধ্যায় সন্ধ্যায় শিবঠাকুর লেনে বাড়ি ফিরতেন।
এখন ট্রামের লাইন ভিতরে এসে পড়ায় পার্কে বসার আর সে আনন্দ নেই। অথচ এই ভিড়ে গলদঘর্ম অবস্থায় ঝুলতে ঝুলতে বাড়ি ফেরাই বা যায় কী করে?
আর শুধু তাই নয়। দিনের মধ্যে একটা ঘণ্টা অন্তত একটু চুপচাপ বসে থেকে কলকাতার যেটুকু খোলামেলা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আছে সেটুকু উপভোগ করা–এ না হলে বদনবাবুর যেন জীবনই বৃথা। রোনি হলেও কল্পনাপ্রবণ তিনি। এই কার্জন পার্কেই বসে মনে মনে তিনি কত গল্পই কেঁদেছেন। কিন্তু লেখা হয়ে ওঠেনি কোনওদিন। সময় কোথায়? লিখলে হয়তো নামটাম করতে পারতেন এমন বিশ্বাস তাঁর আছে।
অবিশ্যি গল্পগুলো যে সবই মাঠে মারা গেছে তা নয়।
তাঁর পঙ্গু ছেলে বিলটু এখন বড় হয়েছে। সাত বছর বয়স তার। সে বিছানা ছেড়ে উঠতে পারে না। ফলে তার অনেকখানি সময় হয় মার কাছে না-হয় বাবার কাছে গল্প শুনে কাটে। জানা গল্প, ছাপা গল্প, ভূতের গল্প, হাসির গল্প, দেশবিদেশের রূপকথা, উপকথা, প্রায় সবই তার গত তিন বছরে শোনা হয়ে গেছে। কম করে হাজার গল্প। ইদানীং বদনবাবু তাকে রোজ রাত্রে শোয়ার আগে একটি করে নতুন গল্প বানিয়ে বলেছেন। এ গল্প তাঁর কার্জন পার্কে বসেই বানানো।
কিন্তু গত একমাসে এ নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটেছে অনেকবার। যেকটি গল্প বলেছেন তাও যে তেমন জমেনি তা বিলটুর মুখ দেখেই বোঝা গেছে। তা হবে না-ই বা কেন? একে তো এমনিতেই আপিসে কাজের চাপ, তার উপরে বিশ্রামের জায়গাটির সঙ্গে চিন্তার সুযোগটিও যে লোপ পেয়েছে।
কার্জন পার্ক ছাড়ার পর ক’দিন লালদিঘির ধারটায় গিয়ে বসেছিলেন। ভাল লাগেনি। টেলিফোনের ওই অতিকায় রাক্ষুসে বাড়িটা আকাশের অনেকখানি খেয়ে ফেলে সব মাটি করে দিয়েছে।
তারপরে অবিশ্যি লালদিঘির মাঠেও চলে এসেছে ট্রামের রাস্তা এবং বদনবাবুও বিশ্রামের অন্য জায়গা খুঁজতে বাধ্য হয়েছেন।
আজ তিনি এসেছেন গঙ্গার ধারে।
আউটরাম ঘাটের দক্ষিণে, রেললাইনের ধার দিয়ে পোয়াটাক পথ গিয়ে এই বেঞ্চি। ওই দেখা যাচ্ছে তোপের কেল্লা। লোহার শিকের মাথায় বলটা এখনও রয়েছে। যেন কাঠির ডগায় আলুর দম।
বদনবাবুর ইস্কুলের কথা মনে পড়ে গেল। একটা বাজলেই গুডুম করে তোপের শব্দ, আর টিফিনের ছুটি, আর হেডমাস্টার হরিনাথবাবুর ট্যাঁকঘড়ি মেলানো।
জায়গাটা ঠিক নির্জন বলা চলে না। সামনেই নদীতে সার-সার নৌকো বাঁধা আর তার উপরে মাঝিমাল্লাদের কথাবার্তা। দূরে একটা ছাই রঙের জাপানি জাহাজ এসে নোঙর ফেলেছে। আরও দূরে, খিদিরপুরের দিকটায়, সন্ধ্যায় আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাস্তুল আর কপিকলের ঝাড়।
বাঃ, বেশ জায়গা।
বেঞ্চিটায় বসা যাক।
ওই যে শুকতারা, স্টিমারের ধোঁয়ার ভিতর দিয়ে আবছা আবছা দেখা যায়।
বদনবাবুর মনে হল যেন অনেকদিন তিনি এতখানি আকাশ একসঙ্গে দেখেননি। আহা, কী বিরাট, কী বিশাল! এমন না হলে কল্পনার পাখি ডানা মেলে উড়বে কী করে?
বদনবাবু ক্যাম্বিসের জুতোটা খুলে পা তুলে বাবু হয়ে বসলেন।
আজ তিনি, একটা কেন, অনেকগুলো গল্পের প্লট ফাঁদবেন এখানে বসে। এতদিনের অভাব মিটিয়ে নেবেন।
বিলটুর খুশি-ভরা মুখটা তিনি যেন চোখের সামনে দেখতে পেলেন।
নমস্কার!
এই রে! এখানেও ব্যাঘাত?
বদনবাবু ফিরে দেখলেন একটি লিকলিকে রোগা লোক, বছর পঞ্চাশেক বয়স, পরনে খয়েরি কোট-প্যান্ট, কাঁধে চটের থলি। সন্ধ্যার ফিকে আলোয় মুখ ভাল বোঝা যাচ্ছে না, তবে চোখের দৃষ্টি যেন অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ।
আর ওটা কী? স্টেথোস্কোপ নাকি?
ভদ্রলোকের বুকের কাছে একটি ঝোলায়মান যন্ত্র থেকে দুটি রবারের নল বেরিয়ে তাঁর কানের মধ্যে ঢুকেছে।
আগন্তুক মৃদু হেসে বললেন, ‘ডিসটার্ব করছি না তো? কিছু মনে করবেন না। আপনাকে এখানে আগে কখনও দেখিনি, তাই…’
বদনবাবু বেজায় বিরক্ত হলেন। বেশ তো নিরিবিলি ছিলাম রে বাপু! কেন মিছে গায়ে পড়ে আলাপ রা? সব মাটি হয়ে গেল। বেচারি বিলটুকে কী কৈফিয়ত দেবেন তিনি?
মুখে বললেন, ‘আগে আসিনি, তাই দেখেননি আর কি। এতবড় শহরে দেখার চেয়ে না-দেখার লোকের সংখ্যাই বেশি নয় কি?’
আগন্তুক বদনবাবুর শ্লেষ অগ্রাহ্য করে বললেন, আমি আসছি আজ চার বছর ধরে, সমানে।
‘ও।‘
‘ঠিক এইখানে। এই একই জায়গায়। এই বেঞ্চিতে। এটাই আমার এক্সপেরিমেন্টের জায়গা কিনা!’
এক্সপেরিমেন্ট? গঙ্গার ধারে খোলা মাঠে আবার এক্সপেরিমেন্ট কী? লোকটা ছিটগ্রস্ত নাকি?
কিংবা যদি অন্য কিছু হয়? গুণ্ডা-টুণ্ডা জাতীয় কিছু? কলকাতা শহর তো, কিছুই বলা যায় না।
সর্বনাশ! বদনবাবু আজ মাইনে পেয়েছেন। ট্যাঁকে রুমালে বাঁধা দু’খানা কড়কড়ে একশো টাকার নোট। তা ছাড়া পকেটে মানিব্যাগে নোট-খুচরো মিলিয়ে পঞ্চান্ন টাকা বত্রিশ নয়া পয়সা।
বদনবাবু উঠে পড়লেন। সাবধানের মার নেই।
‘সে কী মশাই? চললেন? রাগ করলেন নাকি?
‘না। না।’
‘তবে? এই তো বসলেন। এর মধ্যেই উঠছেন?’
সত্যিই তো! তিনি এমন ছেলেমানুষি করছেন কেন? ভয় কীসের? ত্রিশ গজ দূরে সামনের নৌকোগুলোতে অন্তত শখানেক লোক।
বদনবাবু তাও বললেন, ‘যাই, দেরি হল।’
‘দেরি? সবে তো সাড়ে-পাঁচটা।’
‘অনেকখানি পথ যেতে হবে।’
‘কতখানি?’
‘সেই বাগবাজারে।’
‘আরে রাম রাম। তাও যদি বলতেন শ্রীরামপুর কি চুচড়োকি নিদেনপক্ষে দক্ষিণেশ্বর।’
‘তাও কম কী? ট্রামে করে পাক্কা চল্লিশ মিনিট। তার উপর দশ মিনিটের হাঁটা তো আছেই।’
‘তা বটে!’
আগন্তুক হঠাৎ গম্ভীর হয়ে গেলেন। তারপর বিড়বিড় করে বললেন, ‘চল্লিশ প্লাস দশ–পঞ্চাশ।…আমি আবার মিনিট-ঘণ্টার হিসেবটায় ঠিক অভ্যস্ত নই। আমাদের হচ্ছে…বসুন না! একটুক্ষণ বসে যান।’
বদনবাবু বসলেন।
আগন্তুকের গলার স্বর আর চোখের চাহনির মধ্যে কী জানি একটা আছে যার জন্য বদনবাবু তাঁর অনুরোধ উপেক্ষা করতে পারলেন না। মনে মনে ভাবলেন, একেই বোধহয় বলে হিপ্নটিজম।
আগন্তুক বললেন, আমি যাকে-তাকে আমার পাশে বসতে বলি না। আপনাকে দেখে মনে হল আপনি ভাবুক লোক। কেবলমাত্র টাকা-আনা-পাই-এর হিসেব নিয়ে পৃথিবীর মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকেন না, যেমন আর নিরানব্বই পয়েন্ট নাইন রেকারিং পারসেন্ট লোকে থাকে।…কেমন, ঠিক বলিনি?’
বদনবাবু আমতা-আমতা করে বললেন, ‘আজ্ঞে মানে..’
আপনি বিনয়ীও বটে! সেও ভাল। বড়াই আমি পছন্দ করি না। বড়াই করতে চাইলে আমার চেয়ে বেশি কেউ করতে পারত না।
আগন্তুক থামলেন। তারপর কান থেকে নল দুটো খুলে যন্ত্রটা পাশে বেঞ্চির উপর রেখে বললেন, ভয় হয়। অন্ধকারে অসাবধানে সুইচে হাত পড়ে গেলেই কেলেঙ্কারি।
বদনবাবুর ঠোঁটের ডগায় একটা প্রশ্ন এসে আটকে ছিল, এবার বেরিয়ে পড়ল। —




মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!