কড়া নাড়ার আওয়াজ পেয়ে আপনা থেকেই মুখ থেকে একটা বিরক্তিসূচক শব্দ বেরিয়ে পড়ল।

বিকেল থেকে এই নিয়ে চারবার হল; মানুষে কাজ করে কী করে? কার্তিকটাও সেই যে বাজারে গেছে আর ফেরার নামটি নেই।

লেখাটা বন্ধ করে নিজেকেই উঠে যেতে হল।

দরজা খুলে আমি তো অবাক! আরে, এ যে কান্তিবাবু!

বললাম, কী আশ্চর্য! আসুন, আসুন…

চিনতে পেরেছ?

প্রায় চেনা যায় না বললেই চলে!

ভদ্রলোককে ভিতরের ঘরে এনে বসালাম। সত্যি, দশ বছরে অবিশ্বাস্য পরিবর্তন হয়েছে কান্তিবাবুর চেহারায়। এঁকেই নাইনটিন ফিফটিতে আসামের জঙ্গলে ম্যাগনিফাইং গ্লাস হাতে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়াতে দেখেছি। পঞ্চাশের কাছাকাছি বয়স তখনই। কিন্তু একটি চুলও পাকেনি। আর ওই বয়সে উৎসাহ ও এনার্জির যা নমুনা দেখেছিলাম, তা সচরাচর আমাদের তরুণদের মধ্যেও দেখা যায় না।

তোমার অর্কিডের শখ এখনও আছে দেখছি।

আমার ঘরের জানলায় একটা টবের মধ্যে কান্তিবাবুরই দেওয়া একটা অর্কিড ছিল। শখ এখনও আছে বললে অবিশ্যি ভুল বলা হবে। কান্তিবাবুই গাছপালা সম্পর্কে একটা কৌতূহল আমার মধ্যে জাগিয়ে তুলেছিলেন। তারপর উনি দেশছাড়া হবার পর থেকে ক্রমে সে শখটা আপনা থেকেই উবে গেছে–যেমন অন্য শখগুলোও গেছে। এখন লেখা নিয়েই থাকি। ইদানীং দিনকাল বদলেছে। বই লিখেও আজকাল রোজগার হয়। তিনটি বইয়ের বিক্রির টাকাতেই তো প্রায় সংসার চলে যাচ্ছে। আমার! অবিশ্যি সংসার বলতে আমি, আমার বিধবা মা, আর চাকর কার্তিক। চাকরি একটা আছে বটে, তবে আশা আছে বই থেকে তেমন-তেমন রোজগার হলে চাকরি বাকরি ছেড়ে দিয়ে কেবল লিখব, আর লেখার অবসরে দেশভ্রমণ করব।

কান্তিবাবু বসে থাকতে থাকতে হঠাৎ শিউরে উঠলেন।

বললাম, ঠাণ্ডা লাগছে? জানলাটা বন্ধ করে দেব? এবার কলকাতায় শীতটা…

না, না। ওরকম আজকাল মাঝে মাঝে হয়। বয়স হয়েছে তো? তাই নার্ভগুলো ঠিক…

অনেক প্রশ্ন মাথায় আসছিল। কার্তিক ফিরেছে। ওকে চা আনতে বললাম।

কান্তি বললেন, বেশিক্ষণ বসব না। তোমার উপন্যাস হাতে এসেছিল একখান্ম। তোমার প্রকাশকের কাছ থেকেই ঠিকানা সংগ্রহ করে এখানে এলুম। এসেছি একটা বিশেষ দরকারে।

বলুন না! তবে তার আগে–মানে, কবে দেশে ফিরলেন, কোথায় ছিলেন, কোথায় আছেন, এসবগুলো জানতে খুব ইচ্ছে করছে।

ফিরেছি দুবছর। ছিলুম আমেরিকায়। আছি বারাসাতে।

বারাসাত?

একটি বাড়ি কিনেছি।

বাগান আছে?

আছে।

আর গ্রিনহাউস?

কান্তিবাবুর আগের বাড়ির বাগানে একটি চমৎকার গ্রিনহাউস বা কাঁচের ঘর ছিল, যাতে তিনি তাঁর দুষ্প্রাপ্য গাছপালাগুলিকে তোয়াজে রাখতেন। কতরকম অদ্ভুত গাছ যে দেখেছি সেখানে তার ঠিক নেই! এই অর্কিডই তো প্রায় ষাট-পঁয়ষট্টি রকমের। তার ফুলের বৈচিত্র্য উপভোগ করেই একটা পুরো দিন অনায়াসে কাটিয়ে দেওয়া যেত।

কান্তিবাবু একটু ভেবে বললেন, হ্যাঁ। একটা গ্রিনহাউসও আছে।

আপনার গাছপালার শখ তা হলে এই দশ বছরে কিছু কমেনি?

না।

কান্তিবাবু আমার ঘরের উত্তরের দেয়ালের দিকে চেয়ে রয়েছেন দেখে আমারও চোখ সেইদিকে গেল। মাথাসমেত একটি রয়াল বেঙ্গলের ছাল সেখানে ঝোলানো রয়েছে। বললাম, চিনতে পারছেন?

এটা সেই বাঘটাই তো?

হ্যাঁ। ওই দেখুন কানের পাশটায় বুলেটের ফুটোটাও রয়েছে।

আশ্চর্য টিপ ছিল তোমার। এখনও চালাতে পারো ওরকম অব্যর্থ গুলি?

জানি না। অনেকদিন পরীক্ষা করিনি। শিকার ছেড়েছি প্রায় পাঁচ-সাত বছর।

কেন?

অনেক তো মারলাম। বয়স হয়েছে, তাই আর প্রাণিহত্যা…

মাছ-মাংস ছেড়েছ নাকি? নিরামিষ খাচ্ছ?

না।

তবে? এ তো শুধু হত্যা। বাঘ মারলে, কি কুমির মারলে, কি মোষ মারলে–ছাল ছাড়িয়ে মাথা স্টাফ করে, কি শিং মাউন্ট করে দেয়ালে টাঙিয়ে রাখলে। ঘরের শোভা বাড়ল, এসে কেউ আঁতকে উঠল, কেউ বাহবা দিল, তোমারও জোয়ান বয়সের অ্যাডভেঞ্চারের কথা মনে পড়ে গেল। আর মুরগি ছাগল ইলিশ মাগুর যে নিজে চিবিয়ে খেয়ে ফেলছ হে! শুধু প্রাণিহত্যা নয়, প্রাণী হজম–অ্যাঁ?

কী আর বলি! অস্বীকার করতে পারলাম না।

কার্তিক চা দিয়ে গেল।

কান্তিবাবু কিছুক্ষণ গম্ভীর থেকে হঠাৎ আবার শিউরে উঠে চায়ের পেয়ালাটা তুলে নিলেন। চুমুক দিয়ে বললেন, জীবে জীবে খাদ্য-খাদক সম্পর্ক সে তো সৃষ্টির গোড়ার কথা হে! ওই যে টিকটিকিটা ওত পেতে রয়েছে, দেখেছ?

দেখলাম কিং কোম্পানির ক্যালেন্ডারটার ঠিক উপরেই একটা টিকটিকি তার থেকে ইঞ্চিখানেক দূরে একটা উচ্চিংড়ের দিকে নিষ্পলক দৃষ্টিতে চেয়ে রয়েছে। তারপর দেখতে দেখতে গুটিগুটি করে অতীব সন্তর্পণে পোকাটার দিকে অগ্রসর হয়ে হঠাৎ তীরের মতো এক ছোবলে সেটাকে মুখে পুরে নিল।

কান্তিবাবু বললেন, ব্যস। চলল ডিনার। খালি খাওয়া আর খাওয়া। খাওয়াটাই সব। বাঘে মানুষ খাচ্ছে, মানুষ ছাগল খাচ্ছে, আর ছাগল কী না খাচ্ছে! ভাবতে গেলে কী বন্য, কী আদিম, কী হিংস্র মনে হয় বলো তো! অথচ এই হল নিয়ম। এ ছাড়া গতি নেই। এ না হলে সৃষ্টি অচল হয়ে যাবে।

নিরামিষ খাওয়াটা বোধহয় এর চেয়ে অনেক…ইয়ে?

কে বললে তোমায়? শাকসবজি তরি-তরকারি এসবের কি প্রাণ নেই?

তা তো আছেই! জগদীশ বোস আর আপনার দৌলতে সেকথা সবসময়ই মনে থাকে। তবে, মানে ঠিক সেরকম প্রাণ নয় তো! গাছপালা আর জীবজন্তু কি এক?

তোমার মতে কি দুয়ে অনেক প্রভেদ?

প্রভেদ নয়? যেমন ধরুন–গাছ হেঁটে বেড়াতে পারে না, শব্দ করতে পারে না, মনের ভাব প্রকাশ করতে পারে না–এমনকী, মন বলে যে কিছু আছে তাই তো বোধহয় বোঝবার কোনও উপায় নেই। তাই নয় কি?

কান্তিবাবু কী জানি বলতে গিয়েও বললেন না।

চা-টা শেষ করে কিছুক্ষণ মাথা নিচু করে বসে থেকে অবশেষে আমার দিকে চোখ তুলে চাইলেন। তাঁর চোখের করুণ সংশয়াকুল দৃষ্টি দেখে আমার মনটা হঠাৎ কেমন যেন একটা অজানা আশঙ্কায় ভরে উঠল। সত্যি, ভদ্রলোকের চেহারায় কী আশ্চর্য পরিবর্তন ঘটেছে।

কান্তিবাবু ধীরকণ্ঠে বললেন, পরিমল, আমার বাড়ি এখান থেকে একুশ মাইল। আটান্ন বছর বয়সে নিজে কলেজ স্ট্রিট পাড়ায় ঘোরাঘুরি করে তোমার ঠিকানা সংগ্রহ করে যখন এখানে এসেছি, তখন নিশ্চয়ই তার একটা গূঢ় কারণ আছে। এটা বুঝতে পারছ তো? না কি ওইসব আজেবাজে রঙ চড়ানো গল্পগুলো লিখে সে বুদ্ধিটাও হারিয়েছ? ভাবছ–লোকটা একটা টাইপ বটে! একটা গল্পে লাগাতে পারলে বেশ হয়!

লজ্জায় আমার মাথা হেঁট হয়ে গেল। কান্তিবাবু ভুল বলেননি। তাঁকে একটা গল্পের চরিত্র হিসাবে ব্যবহার করার পরিকল্পনা মনের আনাচে কানাচে সত্যিই ঘোরাফেরা করছিল।

ভদ্রলোক বললেন, জীবনের সঙ্গে যোগ বিচ্ছিন্ন হলে যা-ই লেখো না কেন, সব ফাঁকা আর ফাঁকি হয়ে যাবে। আর এটাও মনে রেখো যে তুমি কল্পনায় যতই রঙ চড়াও না কেন, বাস্তবের চেয়ে কখনওই তা বেশি বিস্ময়কর হতে পারবে না।…যাক গে, আমি তোমায় উপদেশ দিতে আসিনি। আমি এসেছি, সত্যি বলতে কি, তোমার সাহায্য ভিক্ষে করতে।

কান্তিবাবু আবার বাঘটার দিকে চাইলেন। কী সাহায্যের কথা বলছেন ভদ্রলোক?