আমি আনন্দে আটখানা হয়ে ‘রাজা রাজা’ বলে ডেকে উঠলুম। আমার পরিচিত কণ্ঠস্বর শুনে সে তৎক্ষণাৎ আমার দিকে মুখ ফেরাল, আমাকে দেখে অনন্দে মাথা নাড়াতে নাড়াতে আমার কাছে এল। আমি তাকে হাতে করে বুকের কাছে তুলে নিলুম।আর ‘রাজা’ বলে সাদরে তার মাথায় হাত বুলোতে লাগলুম। সেও তার স্নেহ- কোমল চোখ দুটি দুলে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে ‘কু-উ-ম’ ‘কু-উ-ম’ বলে পুরানো বন্ধুর সংবর্ধনা করতে লাগল।
রহিম চোরের মত চুপ করে এই পুনর্মিলন দেখছিল। ক্ষণিকের জন্য সে স্তম্ভিত নির্বাক হয়ে গিয়েছিল। আত্মসংবরণ করে শেষে বলে উঠল, ‘রাজা রাজা কী বলছিস কামাল? এতো তোর পায়রা নয়। আমি যেএকে পরশু দিন নবাবপুর থেকে কিনে এনেছি।’
তার এ নির্লজ্জ মিথ্যা কথা শুনে আশ্চর্য হয়ে আমি বললুম, ‘কী বলিস রহিম? এ আমার রাজা বই কি! আমি ডাকতেই কেমন চলে এল। আর দেখ, আমার কাছে কেমন চুপটি করে পড়ে আছে। অচেনা পায়রা হলে কী এমন করত?’
রহিম উত্তেজিত কণ্ঠে বলল, ‘তা বললে কী হয়! ও আমার পায়রা, ওকে ছেড়ে দে’ কথাটা বলেই রাজাকে ধরবার জন্য সে হাত বাড়াল। পাছে রাজার চোট লাগে এই ভয়ে আমি তখন তাকে মাটিতে বসিয়ে দিলুম আর মিনতি করে বললুম, ‘ভাই, আমার পায়রা অমায় ফিরিয়ে দে।’ রহিম মাথা নেড়ে বলল, ‘তাই কি হয়, ও যে আমার কেনা পায়রা।’ আমি বললুম, তাহলে আমি দাম দিচ্ছি আমার কাছে বেচে ফেল।’ রহিম ধীরভাবে বলল, আমি বেচব না।’
রাজাকে তার সেই ঘৃণিত কয়েদ থেকে উদ্ধার করবার কোন উপায় না দেখে আমার মনটা একেবারে দমে গেল,আর আমার চোখ দুটি অশ্রুতে ভরে উঠল। পাছে রহিম আমার কান্না দেখতে পায়, এই ভয়ে সেখনে আর ক্ষণমাত্র অপেক্ষা না করে আমি অতি ব্যস্তভাবে বাড়ির দিকে চলতে লাগলুম। দূর থেকে রহিমের নিষ্ঠুর কণ্ঠস্বর কানে আসতে লাগল, ‘কোথা যাসরে কামাল? চল না বরজ পোতায় কুল পাড়িগে।’ তার কথায় কোনো উত্তর না দিয়ে সজল চোখে আমি সেদিন বাড়ি ফিরলুম।
এই ঘটনার পর প্রায় দুসপ্তাহ কেটে গেছে। দৈনিক নিয়ম মত বিকেলে আমার পায়রার গৃহ প্রত্যাবর্তনের জন্য আমি পথ চেয়ে আছি। রাজাকে ফিরে পাবার একটা ক্ষীণ আশা এক একবার আমার অন্তরকে কাঁপিয়ে মনের মধ্যে জেগে উঠছে। আমি উৎসুক ভাবে দিগন্তের দিকে চেয়ে আছি। হঠাৎ আকাশের কোণে একটা ক্ষীণ রেখা দেখে বুঝলুম, আমার পায়রার দল বাড়ি ফিরছে। অন্য দিনের মত আজও আশায় আকাংক্ষায় আমার প্রাণ কাঁপতে লাগল। চোখ দুটিকে হাতের তলায় আড়াল করে আমি দেখতে লাগলুম পায়রার ঝাঁক ক্রমে স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হতে লাগল। একে একে সকলকেই চিনতে পারলুম। কিন্তু রাজাকে আজও তাদের মধ্যে দেখতে পেলুম না। নিরাশ মনে আবার খোপের বারান্দার নেমে এলুম। ঝপঝপ করে পায়রাগুলি নেমে এসে বসল; হঠাৎ কীযেন আমার দৃষ্টিকে আকাশের কোণে টেনে নিয়ে গেল। সুদূর চক্রবালে দেখলুম একটা পায়রা আমার বাড়ির দিকে মুখ করে শোঁ- শোঁ করে উড়ে আসছে। আমার নিরাশ মনে আবার আশার সঞ্চার হল। আমি রেলিং- এ ভর দিয়েউচুঁ হবার চেষ্টা করতে না করতে পায়রাটি কাছে এসে পৌঁছাল, আর সোজা এসে ঝপ করে রেলিং- এর ওপর বসে পড়ল।
আমি আনন্দে নেচে উঠলুম। আমার রাজা আবার ঘরে ফিরেছে। সে সেই নিষ্ঠুর তস্করের হাত থেকে পালিয়ে তার বন্ধুজনের কাছে অবার ফিরে এসেছে। তিন সপ্তাহের দীর্ঘ বিরহে সে আমায় ভোলে নি। সুযোগ পেয়েই সে নি:সঙ্কোচে তার আপর জনের কাছে ফিরে এসেছে। রহিমের চালাকি তাকে আদৌ লক্ষ্যভ্রষ্ট করতে পারেনি।
আমি একান্ত আগ্রহের সঙ্গে তাকে বুকে তুলে নিয়ে তার মুখ চুম্বন করলুম। তারপর তাকে তার বন্ধুর দলে ছেড়ে দিলুম। তার উচ্ছ্বাসময় ‘বাক বাকুম’ রবে আবার আমাদের বারান্দা ভরে গেল।আমার শোকসন্তপ্ত পায়রার দলের মধ্যে যেন কোন তড়িৎস্পর্শে তাদের পুরনো আনন্দ আবার ফিরে এল।রানী তার বিষাদের বিরল কোণ ছেড়ে আবার দলে এসে মিশল,আর মনের আনন্দে রাজার পাশে দলের মধ্যে পায়চারি করে বেড়াতে লাগল।আমি একান্ত তৃপ্তির সংজ্ঞে এই মধুর পুনর্মিলন দৃশ্য দেখতে লাগলুম।দেখতে দেখতে সন্ধ্যা হয়ে গেল।
বিশ্রামের জন্য পায়রারা যে যার খোপে চলে গেল।রাজা তার রানীর সংজ্ঞে আজ তাদের পুরানো খোপে ঢুকলো। আমি সন্তুষ্ট মনে বাইরে এলুম।
রাজার পায়ে নূপুর নেই এ চিন্তা আমার পক্ষে অসহ্য হয়ে উঠল। আমি তখনই মাধব বেণের দোকান থেকে একটি সুন্দর নূপুর কিনে আনলুম।খাওয়া-দাওয়ার পর সেটাকে মাথার কাছে একটি টেবিলের ওপর রেখে বিছানায় শুয়ে পড়লুম।মনে মনে সংকল্প করলুম,সকালে উঠেই নূপুরটি রাজার পায়ে পরিয়ে দেব।
সে রাতটি আমার বেশ আনন্দেই কেটেছিল।বিছানায় শুয়ে শুয়ে অনেকক্ষণ পর্যন্ত রাজার সাহসের কথা,তার মানুষের মতো বুদ্ধির কথা,তার বন্ধুবাৎসল্যের কথা ভাবতে লাগলুম।এই দীর্ঘ বিচ্ছেদের মধ্যে সে যে আমায় ভোলেনিব এই কথা মনে করে আমার হৃদয় স্নেহে ভরে উঠল। দুষ্ট রহিম কেমন রাগে তার হাত মোচড়াচ্ছে আর গালিগালাজ করে তার মনের ভার লাঘব করছে, তা ভেবে আমি যথেষ্ট তৃপ্তি পেলুম।শুয়ে শুয়েই ঠিক করলুম,তাকে কাল রাজার ফেরবার খবর দিতেই হবে।তার মুখের অবস্থা যে কেমন হবে তা ভেবে যথেষ্ট আমোদ পেলুম।এসব সুখের খেয়ালের মধ্যে আস্তে আস্তে কখন ঘুমিয়ে পড়লুম।
সকালে উঠেই নূপুরটি নিয়ে নিচে বারান্দায় গিয়ে “রাজা” বলে ডাকতে লাগলুম।রাজার কোনো সাড়া না পেয়ে এদিক ওদিক দেখতে লাগলুম।অন্যদিনের মতো পায়রাগুলি তাদের জলযোগের জন্য অপেক্ষা করছে না। কেউ ছাদে বসে কাঁদছে, কেউ জড়সড় হয়ে আলিসায় বসে আছে, আভার কাউ নারকেল গাছের ওপর বসে ভীত নেত্রে বারান্দার দিকে চাইছে।রানীকে দেখলুম আলিসায় একটি কোণে মরার মতো বসে আছে। কিন্তু রাহাকে কোথাও দেখতে পেলুম না।হঠাৎ বারান্দায় মেঝের ওপর আমার দৃষ্টি পড়ল।যা দেখলুম তাতে আমার সমস্ত শরীর শিউরে উঠল। মেঝেতে রাশি রাশি পালক ছড়ান রয়েছে, আর জায়গায় জায়গায় রক্তের বড় বড় দাগ।প্রকৃত ঘটনা বুঝতে আমার বাকি রইল না। কোণের কাছে একটা মই দাঁড় করানো ছিল।রাতে সেই মই দিয়ে উঠে খাঠাশে রাজাকে ধরে নিয়ে গেছে।ছেঁড়া পালক আর রক্তের প্রাচুর্যে বুঝলুম রাজা, রাজার মতোই লড়াই করে মরেছে। আর থাকতে পারলুম না।”নানীজান নানীজান! আমার রাজাকে খাটাশে ধরেছে”-বলে চিৎকার করে কেঁদে উঠলুম।
আজ প্রায় ত্রিশ বছর হল রাজাকে হারিয়েছি।তারপর অনেক পাখি পুষেছি,অনেক দেশ ঘুরেছি,অনেক কাজ করেছি,কিন্তু রাজাকে ভুলতে পারিনি। তার সেই “বাক বাকুম” “বাক বাকুম” এখনও আমার কানে ধ্বনিত হচ্ছে, তার সেই সুন্দর মূর্তি এখনও আমার স্নরণে আঁকা রয়েছে।আর তার সেই করুণ গৃহ প্রত্যাবর্তনের স্মৃতি আজও আমার অন্তরকে ব্যথিত করে তুলছে।





মন্তব্য (০)
মন্তব্য করতে লগইন করুন অথবা নিবন্ধন করুন।
এখনো কোনো মন্তব্য নেই। প্রথম মন্তব্যটি আপনিই করুন!