(রাজার অসুখ। তাঁর অসুখ নিয়ে কোটাল, সেনাপতি আর মন্ত্রী ভারি চিন্তিত। তারা এই নিয়ে কথা বলছে।)

কোটাল: মহারাজের শরীর কি একটু ভাল? সেনাপতি : না, না। মহারাজের ভারি অসুখ। কোটাল: মাথায় বরফ দেওয়া হল, দেটে সেঁক দেওয়া হল, একটুও কমে নি? সেনাপতি: কই, ওষুধ খেয়েও কিছু হল না। কোটাল: এখন কি হবে? ডাক্তার-বদ্যি, হাকিম-কবিরাজ সবাই তো ফিরে গেছে। সেনাপতি: জান, মহারাজ ভারি খেপেছেন। কোটাল: সর্বনাশ। কার ওপর? সেনাপতি: হাকিম-কবিরাজের ওপর হুকুম হয়েছে, দেশ ছেড়ে যেতে হবে। কোটাল: তাই তো বলি। যাবার সমর বদ্যিরা ঠকঠক করে কাঁপছিল। সেনাপতি: আমরা সব ভয়ে অস্থির। দেখ তো কোটাল, কে এল? কোটাল: দেখে তো মনে হয় দরবেশ। দরবেশ:আমি মহারাজের চিকিৎসা করব। মন্ত্রীকে খবর দাও। সেনাপতি: (কোটালকে) হাতি-ঘোড়া গেল তল, পিঁপড়ে বলে কত জল! চিকিৎসা করবেন! (দরবেশের দিকে ফিরে) যাও তো কোটাল, মন্ত্রীসাহেবকে খবর দাও। কোটাল: এই যে, মন্ত্রীসাহেব এসে গেছেন। মন্ত্রী: (শুকনো মুখে) আপনি কি চান? দরবেশ: আমি সামান্য মানুষ। তবে মহারাজের অসুখ সারাবার উপায় আমি জানি। মন্ত্রী: সতিা জানেন? দরবেশ: জানি। কিন্তু সে ভারি শক্ত কাজ। তোমরা কি সে সব করতে পারবে? কোটাল: কেন পারব না? সেনাপতি: খুব পারব। মন্ত্রী : জান দিতে হয়, জান দেব। দরবেশ : তা হলে শোন। প্রথমে এমন একজন লোক খুঁজে বের কর, যার মনে কোন ভাবনা নেই, যার মুখে হাসি লেগেই আছে। মন্ত্রী : তারপর? দরবেশ : যে সব সময়, সব অবস্থায় খুশি থাকে। মন্ত্রী : তারপর? দরবেশ : সেই সুখী লোকের জামা যদি মহারাজ এক দিন পরে থাকেন, আর তার তোশকে যদি এক রাত ঘুমিয়ে থাকেন- তা হলেই অসুখ সেরে যাবে। কোটাল : তাই নাকি? সেনাপতি: সে তো খুব সোজা। মন্ত্রী: বাহ্, চমৎকার কথা! তোমরা সব বেরিয়ে পড়, সুখী মানুষের জামা-তোশক নিয়ে এসো।

(দু দিন পর। কোটাল আর সেনাপতি কথা বলছেন, পরে মন্ত্রী আসবেন।)

কোটাল: এখন উপায়? শহর-গ্রাম কোথাও তো খুঁজতে বাকি নেই। কোথায় সুখী মানুষ? সেনাপতি : বুঝলে কোটাল, সুখী মানুষ পাওয়া সহজ হবে না। কোটাল : কেন? সেনাপতি : যার দুঃখ নেই, ভাবনা নেই, সব সময় হাসিমুখ তেমন লোক কোথায় পাব? কোটাল : তা হলে উপায়? মহারাজ কি শেষে বিনা চিকিৎসায় মারা যাবেন? ঐ যে মন্ত্রী এলেন। মন্ত্রী : এসে গেছ? সুখী মানুষের জামা-তোশক কই? সেনাপতি : পাই নি হুজুর। সুখী মানুষ কোথাও নেই। মন্ত্রী : নেই মানে? সেনাপতি : কোথাও খুঁজতে বাকি রাখি নি। মন্ত্রী : মূর্খ, তোমরা খুঁজতেই জান না। চল আমার সঙ্গে। সেনাপতি : চলুন হুজুর। মন্ত্রী : ঐ যে দেখ, নদীর ধারে লোকটা কেমন হাসছে। লোকেরা চারপাশে ভিড় করে মজা দেখছে। সেনাপতি : তাই তো। কেমন মজার গান ধরেছেঃ লাল গানে নীল সুর হাসি হাসি গন্ধ- মন্ত্রী : (হাসতে হাসতে) হাঃ হাঃ, ভারি মজা তো। এই তো সুখী মানুষ, মূর্খরা খুঁজেই পায় না। কোটাল : হুজুর, ও তো রতন পাগলা। এখন খোশমেজাজে আছে। সন্ধ্যাবেলা ওর জ্বালায় পাড়ায় লোক টিকতে পারে না। মন্ত্রী : তাই নাকি। আচ্ছা, গাছতলার ঐ লোকটাকে দেখা যাক। ও লোকটাও খুব হাসছে। সেনাপতি : লোকটা কেমন শুকনো, হাড়-জিরজিরে। কিন্তু হাসছে খুব। মন্ত্রী : (লোকটির কাছে গিয়ে) শোন, তুমি এত হাসছ কেন? লোকটা : হাসব না? পৃথিবীটা বনবন করে ঘুরছে, গাছের পাতা সরে সরে যাচ্ছে, মাঠে মাঠে ঘাস গজাচ্ছে, রোদ উঠছে, বৃষ্টি পড়ছে। মন্ত্রী : তাতে কি? লোকটা : পাখিরা গান গাইছে, গাছের ডালে এসে বসছে, আবার উড়ে যাচ্ছে। এসব দেখছি আর হাসছি। মন্ত্রী : বুঝলাম। কিন্তু বসে বসে হাসলে তো আর দিন চলে না। তোমার কোন কাজ নেই? লোকটা : তা কেন থাকবে না? সকালে নদীতে যাই, গোসল করি। নদীতে ঢেউ ওঠে, পাল তুলে নৌকা যায়। কত মজার দৃশ্য! খেটেখুটে অল্প রোজগার করি। কাজ শেষে এখানে এসে বসি। গাছের শাখা বাতাসে দোলে, শরীর জুড়িয়ে যায়। মন্ত্রী : তারপর? লোকটা : যেদিন খাওয়া জোটে, খাই। যেদিন জোটে না, খাই না। যখন বেড়াতে ইচ্ছে হয় বেড়াই, ঘুম পেলে ঘুমাই। এই তো মজা। মন্ত্রী : না খেলে কষ্ট হয় না তোমার? লোকটা : সেদিন কোন ঝামেলাই নেই। চুপচাপ পড়ে থাকি। খাওয়া পেলেই হাঙ্গামা বেশি। মন্ত্রী : কি রকম হাঙ্গামা ? লোকটা : সেদিন ভাত মাখো রে, মুখের ভেতর ঢোকাওরে, চিবাওরে-। তারপর আবার পানি খাও, হাত মোছ। কত রকম কান্ড! মন্ত্রী : তোমার কোন দুঃখ নেই? লোকটা : নাঃ। দুঃখের ধার ধারি না। সুখে আছি ভাই।

(মন্ত্রী, কোটাল, সেনাপতি পরস্পরের দিকে তাকায়, মাথা নাড়ে)

মন্ত্রী : তোমার গায়ের একটা জামা দেবে ভাই? যত দাম চাও দেব। লোকটা : হাঃ হাঃ! (হাসি)। আমার আবার জামা! এই তো সেদিন একটা লোক একটা চাদর দিয়েছিল, তাও তো এক ভিখিরেকে দিয়ে দিলাম। জামা-টামা নেই। মন্ত্রী : তা হলে তো মহা মুশকিল। আচ্ছা ভাই, তোমার তোশকটা দিতে পার? কত দাম চাও, বল। লোকটা : (হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ে) কত বছর বিছানাই চোখে দেখিনি, তার আবার তোশক! হাঃ হাঃ। মন্ত্রী : তোমার কি অসুখও হয় না? লোকটা : সে আবার কি? অসুখ নিয়ে মাথা ঘামাই না। যারা দিন-রাত অসুখ-অসুখ করে, অসুখ-বিসুখ তাদেরই চেপে ধরে।

(সুকুমার রায়ের গল্প অবলম্বনে)